Monday, April 27, 2020

ইসকনের কীর্তন কুরুক্ষেত্র থেকে করোনা কুরুক্ষেত্রঃ ওরা ৩৫ জন
==

 
 


সম্প্রতি স্বামীবাগ ইসকন মন্দির লকডাউন হওয়ার পর সবার নিকট স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার মসজিদে ১০ জনকে নামায পড়তে না দিলেও ইসকন মন্দিরে ৩৫ জন (বা তারও বেশি) জমায়েত হতে দিয়েছে! এটা নিয়ে যখন সাধারণ মুসলমান এক-আধটু কথা বলা শুরু করেছে, তখন হিন্দুরা ফেসবুকের কমেন্টবক্সে গলাবাজি করে বলছে, জানেন এরা সন্ন্যাসী, এদের ঘরবাড়ি নাই, ত্রাণ দেয়ার কাজে তারা মন্দিরে আছে। মুসলমানগুলো এত্তো খারাপ!

মুসলমানেরগুলোর গোল্ডফিশ মেমোরি, তাই মনে করতে পারছে না ঠিক কোন কারণে এই লকডাউনের সময় ইসকনীরা মন্দিরে থাকবে। ২০১৪ সালের কথা মনে করুন, তখন এই স্বামীবাগ ইসকনের মন্দির থেকে হিন্দু পুলিশ পাঠিয়ে হুমকি দেয়া হয়েছিল, ইসকনের কিত্তন আছে। ইসকনের কীর্তনের জন্য তাড়াতাড়ি রাত ১০টার মধ্যে তাবারীহ নামায শেষ করতে হবে, নতুবা মসজিদে ‘তালা ঝুলিয়ে’ দেয়া হবে। তখন এ নিয়ে সংঘর্ষে ইসকনীদের ছোড়া ইটের আঘাতে ৮-১০ জন মুসল্লী আহত হয়েছিল।

২০১৬ সাল, সিলেটের কাজলশাহ ইসকন মন্দির, সেখানে জুমার নামাযের সময়েও তারা কীর্তনের সাউন্ডবক্স এতটুকু কমাতে রাজি হয়নি। দরজা বন্ধ করে বিকট শব্দে সাউন্ড বক্স, আর প্রতিবাদ করতে আসলে মন্দিরের পাঁচিলের ওপর থেকে হিন্দু পুলিশের বন্দুকের নল বের করে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে গুলি।

তারাবী, জুমা থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক যে কীর্তন স্বামীবাগের ইসকনীরা করে যাচ্ছে, করোনার লকডাউনেও কি তা বন্ধ থাকবে? প্রশ্নই উঠে না! এরা কি মুসলমানদের মতো ভ্যাবদা নাকি, চাকমা মেজিস্ট্রেট জরিমানা করবে আর গুড বয়ের মতো তা দিয়ে দেবে? তারা লকডাউনেও প্রতিদিন কীর্তন করছে এবং ফেসবুকে তা লাইভ প্রচার করছে। সার্বক্ষণিক কীর্তনের জন্য এখনও ইসকন মন্দিরে প্রচুর লোকবল রয়েছে এবং এতে করেই আক্রান্ত হয়েছে ‘ওরা ৩৫ জন’।

এই কীর্তন হচ্ছে তাদের মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মতো, মুসলমান সামান্য প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর ইট-পাটকেল-হিন্দু পুলিশের বন্দুক হাতে ঝাঁপিয়ে পড়া হবে। এই কীর্তন কুরুক্ষেত্র এখন পরিণত হয়েছে করোনা কুরুক্ষেত্রে। পর্দার আড়ালের খবর হলো, স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে করোনায় বেশ কয়েকজন মারাও গিয়েছে, কিন্তু এই তথ্য মিডিয়া ব্ল্যাকআউট করা হয়েছে। মারা না গেলে ওখানে ৩৫ জন (আসলে তারও বেশি) যে করোনা আক্রান্ত, সেটা মানুষ জানতেও পারত না।

তবে স্বামীবাগের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে চট্টগ্রামে প্রবর্তক ইসকন মন্দিরে, পুন্ডরিক ধামে। কারণ চট্টগ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদের নাভি, সেখানে এই করোনার সময়েই প্রচুর বিদেশী ইসকনী এসেছে চট্টগ্রামে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি মন্দির উদ্বোধন করতে, যেটি তাদের প্রধান কার্যালয় হতো। সরকার এবং মিডিয়া তা নিয়ে কোনো কথা বলছে না, আর মুসলমান অছাম্প্রদায়িকতাবশত প্রতীক্ষা করছে তাদের ধ্বংসের জন্য।

(নিচে গত ২৫ এপ্রিল তারিখের লাইভ ভিডিওর স্ক্রীনশট দেয়া হলেও ইসকন স্বামীবাগ মন্দির প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও কীর্তনের ভিডিও লাইভ ব্রডকাস্ট করেছে, গতকাল সন্ধ্যায়ও করেছিল। যার লিঙ্ক https://www.facebook.com/IskconTVDhaka/videos/231156568110113/?hc_location=ufi )
https://assets.roar.media/Bangla/2018/01/jews.jpg
 

ইহুদী ও ইসরাইল- এ শব্দ দুটো কোথাও পড়লে, কিংবা দেখলেই ধর্মীয় অনুভূতিগতভাবেই হোক আর যে কারণেই হোক, বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেন। এর পেছনে কারণ কী?
কারণটা নিহিত রয়েছে ঐতিহাসিক কিছু দ্বৈরথ, ইহুদী ষড়যন্ত্র আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সদস্য ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপর নির্মম নির্যাতন- এ সব কিছুর মাঝে। তাছাড়া গাজা বা পশ্চিম তীরের সংঘাত এবং অতি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবের বদলে পবিত্র জেরুজালেমকে ঘোষণা করায় এই ইহুদী বিদ্বেষ স্বাভাবিকভাবেই আবার দেখা যায় সাধারণ মুসলিমদের মাঝে।

ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব


কিন্তু এ তো গেলো মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠে কী আছে? ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হচ্ছে এটা সর্বজনবিদিত, কিন্তু ইসরাইলের দৃষ্টিকোণটা এখানে কী? ইহুদীরা কীসের ভিত্তিতেই বা জেরুজালেমকে নিজেদের দাবী করে? কীসের জোরে তারা বিশ্বাস করে এই পবিত্র ভূমি কেবলই তাদের? যদি ইহুদীদের দিক থেকে এরকমটা না করা হতো তবে এই সংঘাতের সৃষ্টি হতো না। তাই অরাজকতা, অস্থিরতা, অন্যায়- যে নামেই এ পরিস্থিতিকে ডাকা হোক না কেন, এর পেছনের গভীর কারণ লুকিয়ে আছে ইহুদী জাতির ইতিহাসে, যে ইতিহাসটা তারা নিজেরা বিশ্বাস করে।
পাঠকদের জন্য একদম গোড়া থেকে ধীরে ধীরে এ ঐতিহাসিক সিরিজে তুলে ধরা হবে মুসলিম ও ইহুদীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই জাতির ইতিহাসকে, যে জাতি ‘বনী ইসরাইল’ নামেও পরিচিত। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, পবিত্র ভূমি দখলের আড়ালের বিশ্বাসটুকু জানতেও সাহায্য করবে এ সিরিজটি। হযরত ইয়াকুব (আ) থেকে শুরু করে একদম হযরত ঈসা (আ) এর আগ পর্যন্ত (অর্থাৎ খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু হবার আগপর্যন্ত) ঘটনাগুলো তুলে ধরা হবে, মুদ্রার দু’পিঠ থেকেই। পবিত্র কুরআন, তাফসির ইবনে কাসিরে যে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করা আছে, সে একই ঘটনাগুলো ইহুদীরা কীভাবে দেখে? যে ঘটনাগুলো তাফসিরে বা মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে নেই, সেই শূন্যস্থান আমরা পূরণ করব ইহুদীদের নিজস্ব ঘটনা দিয়ে, যেগুলোর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে, তারা কেন জেঁকে বসেছে পবিত্র ভূমিতে। এ সিরিজে জানা যাবে অলৌকিক সিন্দুক ‘তাবুত-এ-সাকিনা’ বা ‘আর্ক অফ দ্য কোভেন্যান্ট’ এর বিস্তারিত- এ ব্যাপারে কুরআন এবং ইহুদী গ্রন্থ কী বলে? মূসা (আ), ইউশা (আ), দাউদ (আ), সুলাইমান (আ) থেকে ঈসা (আ) পর্যন্ত কী কী ঘটনা ঘটেছিল যার মাধ্যমে পবিত্র ভূমির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি হয়? মিসর থেকে লোহিত সাগর বিভক্ত করে কীভাবে ইসরাইল জাতি মুক্তি পেয়েছিল? পবিত্র ভূমিতে পৌঁছাবার আগে কেন বছরের পর বছর তাদের মরুভূমিতে শাস্তি পেতে হয়েছিল? পরবর্তীতে কেন এবং কীভাবে ইহুদীরা নির্বাসিত হয় পবিত্র ভূমি থেকে, কী ছিল তাদের দোষ? কেন তারা ঈসা (আ) বা যীশু খ্রিস্টকে অস্বীকার করেছিল? তারা বিশেষ কার প্রতীক্ষায় ছিল? কীভাবে নির্মিত হলো বাইতুল মুকাদ্দাস? আর এখন এ ভূমিতে এতদিন পরে ফিরেই বা ইহুদী জাতির কী যায় আসে?

 
গোধূলির জেরুজালেম

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অল্প অল্প করে আমরা বের করবার চেষ্টা করব ইসলামি উৎসগুলোর পাশাপাশি ইহুদী বিশ্বাসের তাওরাত ও অন্যান্য নবীদের নিয়ে লেখা পুস্তক থেকে; এছাড়াও আমরা ঘেঁটে দেখব ইহুদী ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থসহ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ আর তাদের আইনগ্রন্থ তালমুদেও এ ব্যাপারে কিছু রয়েছে কিনা।
‘ইহুদী’ বা বহুবচন ‘ইহুদীম’ (יְהוּדִים‎‎) শব্দটি হিব্রু। সেমেটিক ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ধর্ম হল ইহুদী ধর্ম (Judaism)। অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, ইহুদীদের ইংরেজিতে Jew বলে কেন? আরামায়িক শব্দ ‘ইয়াহুদাই’ (Y’hūdāi) থেকে গ্রিক শব্দ Ioudaios আসে। হিব্রুতে উচ্চারণ ‘এহুদী’ বা ‘ইহুদী’। আর এরপরে শব্দের শুরুর Y স্বরবর্ণ ইউরোপীয় ভাষায় J দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সে হিসেবে ইহুদী –> জিহুদি –> জিউ (জ্যু)। মূল ইয়াহুদাই শব্দের আক্ষরিক অর্থ আসলে ‘যে বাস করে এহুদিয়া প্রদেশে’, কিন্তু সেই এহুদিয়া-র হিব্রু ‘হুদা’ অর্থ আসলে ‘যে নিজেকে সমর্পণ করে’ (আরবি ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থও একই)। এহুদা ছিলেন হযরত ইয়াকুব (আ) বা ইসরাইল (আ) এর চতুর্থ পুত্র। তাঁর বংশধরেরা থাকতেন সেই প্রদেশে। তবে পারিভাষিকভাবে, বনী ইসরাইলকেই ইহুদী বলা হয়। সত্যি বলতে, ‘ইহুদী’ যতটা না ধর্মপরিচয়, তার চেয়ে বেশি বংশপরিচয় কিংবা জাতিপরিচয় (Ethnicity)। এ কারণে, একজন ইহুদী নাস্তিক হতেই পারেন, কিন্তু যেহেতু তিনি ইসরাইলের বংশধর, সেজন্য বংশগত বা জাতিগতভাবে তিনি ইহুদী নামেই পরিচিত হবেন।
মূলত ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে এই ভূমি দখলের সমস্ত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের পক্ষবাদী যে ইহুদীরা তাদেরকে জায়নবাদী বা জায়োনিস্ট (Zionist) বলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে শুরু হওয়া এ জায়োনিজমের বাস্তবিক প্রয়োগ আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, এর প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জল নামের একজন ইহুদী। জায়োনিজম শব্দটা এসেছে জায়োন থেকে। জায়োন বা সিওন হলো জেরুজালেমের একটি টিলা, বাইতুল মুকাদ্দাস যে টেম্পল মাউন্টে অবস্থিত তারই দক্ষিণ অংশ। এ জায়গাটা জেরুজালেমের পবিত্রতম জায়গা বিধায় জায়ন শব্দ দিয়েই জেরুজালেম বা ‘সিটি অফ ডেভিড (দাউদ)’-কে বোঝানো হয়। এক্ষেত্রে, জায়োনিজম আন্দোলন হলো ‘জায়ন’ বা ইহুদীদের ‘জেরুজালেম’ পুনরুদ্ধার আন্দোলন, বৃহত্তর অর্থে পুরো পবিত্র ভূমি অধিকার করে নেয়া। এই পবিত্র ভূমি বলতে আসলে কী বোঝায় সেটা আমরা এ সিরিজে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেই জানতে পারব। তবে এ সিরিজের টপিক নিয়ে পাঠকদের মনে প্রশ্ন থাকবেই অনেক, যেগুলোর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পর্বে উত্তর দেয়া হবে; প্রশ্নগুলো জ্ঞানপিপাসী পাঠকেরা কমেন্ট সেকশনে করতে পারেন।

 ১৮৯৭ সালে এই থিওডোর হার্জল শুরু করেন জায়োনিজম আন্দোলন

১৮৯৭ সালে এই থিওডোর হার্জল শুরু করেন জায়োনিজম আন্দোলন; Source: Wikimedia Commons
কিন্তু এ জায়োনিস্টদের নিন্দিত কর্মের জন্য এমনকি নিরীহ ইহুদী পরিবারদেরও ফলাওভাবে ঘৃণা করা হয়, যারা হয়ত এ মতবাদ সমর্থন করে না। যেমন নিচের ছবিতে ইহুদীদের দেখা যাচ্ছে এই মৌলবাদী গোঁড়া জায়োনিজমের প্রতিবাদ করতে।

 রিটিব্রিটিশ ইহুদীরা প্রতিবাদ করছে জায়োনিজমের এবং আন্দোলন করছে স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য; Source: Vice


 ইসরাইলের কয়েকজন ধার্মিক ইহুদীকে দেখা যাচ্ছে জায়োনিজমের প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে; Source: GettyImages


সবচেয়ে পুরনো সেমিটিক ধর্ম হলেও ইহুদীদের সংখ্যা কিন্তু খুবই কম, তবে অনেক প্রভাবশালী জায়গাতেই তাদের অবস্থান রয়েছে। ইসরাইল ন্যাশনাল নিউজ ডট কমের সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ইহুদী জনসংখ্যা ১৪৪ লক্ষ। অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.২% !! এর মাঝে ৬৩ লক্ষ ইসরাইলে আর বাকিরা বাকি দেশগুলো মিলিয়ে- প্রধানত আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর কানাডায়। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ৭৫% হলো ইহুদী।
ইহুদীরা মুসলিমদের মতই বংশ পরম্পরা হিসেব করে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) থেকে। অর্থাৎ পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। ইব্রাহিমের (আঃ) প্রধান ২ ছেলে ইসমাইল (আঃ) আর ইসহাক  (আঃ)  (ইহুদী তাওরাত অনুযায়ী ইব্রাহিম (আঃ) এর পরে আরো ছয় পুত্র হয় তৃতীয় স্ত্রী কেতুরার গর্ভে)। এর মাঝে, হযরত ইসহাক (আঃ) (ইংরেজিতে Isaac) এর ছেলে ছিলেন ইয়াকুব (আঃ) (Jacob)। ইয়াকুব ) (আঃ) এর আরেক নাম ছিল ইসরাইল (আঃ) ; এ নামটাই ইহুদীরা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ইয়াকুব (আঃ) থেকেই আমাদের এই ইতিহাস শুরু হবে। তবে এই ‘ইতিহাস’ কিন্তু কেবলই ধর্মীয় ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এগুলো তেমন আমলে আনা হয় না। একদমই যে কিছু পাওয়া যায়নি তা নয়, তবে এত আগের খুব কম জিনিসই পাওয়া গিয়েছে।

হিব্রু বাইবেল, যা বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত খ্রিস্টানদের বাইবেল থেকে কিছুটা আলাদা; Source: ancient-hebrew.org


ইহুদীদের বর্তমান ভাষা হিব্রু, যদিও দু’হাজার বছর আগে ঐ অঞ্চলে আরামায়িক ছিল কথ্য ভাষা, হিব্রু প্রধানত লিখবার ভাষা (ফর্মাল)। হিব্রুকে তারা বলে ‘পবিত্র ভাষা’; আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিব্রুর ব্যবহার ছিল ভালই। কিন্তু এরপর প্রায় ১৬টি শতাব্দী জুড়ে হিব্রু ছিল কেবলই একটি মৃত ভাষা। কিন্তু ১৮৮১ সালে এলিয়েজার বিন ইয়াহুদা (Eliezer Ben-Yehuda) এ মৃত ভাষাকে পুনর্জীবিত করবার কাজ শুরু করেন এবং বিংশ শতকের প্রথমদিকে পুরোপুরি চালু হয়ে যায় হিব্রু। এখন ইসরাইলের একটি রাষ্ট্রভাষা হিব্রু। মুসলিমদের পবিত্র ভাষা আরবি ও ইহুদীদের পবিত্র ভাষা হিব্রু দুটোই সেমিটিক ভাষা হবার কারণে এদের মাঝে অনেক মিল। দুটোই ডান থেকে বামে লিখা হয়। তবে আরবিতে ২৯/৩০টি বর্ণ থাকলেও হিব্রুতে মাত্র ২২টি বর্ণ; তবে আরবির চেয়ে হিব্রুতে স্বর উচ্চারণ বেশি করা যায়।
হিব্রু বর্ণমালা, কিছু বর্ণের ভিন্নরূপসহ; Source: MyGraphicHunt


বেসিক’ যতটুকু জানবার সেটা তো জানা হলোই, আর এছাড়াও যা যা জানবার প্রয়োজন হবে সেগুলো জায়গা মতো উল্লেখ্য  করা হবে। এবার কাহিনীতে প্রবেশ করবার পালা। তবে দেরি না করে এখনই শুরু করা যাক, হারিয়ে যাওয়া যাক বহু আগের মধ্যপ্রাচ্যে, যখনও ইহুদী শব্দটির প্রচলন হয়নি!
খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সতেরশ বছর আগে। ‘বীরশেবা’ নামের এক মরুঅঞ্চল থেকে রওনা দিলেন মানুষটি। গন্তব্য তাঁর ‘হারান’, সেখানে তাঁর যাত্রাবিরতি নেবার পরিকল্পনা।
হারানে পৌঁছালেন যখন তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে। রাতের বেলা তিনি ভ্রমণ না করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেখানে আছেন সেখানেই একটা পাথর যোগাড় করে মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পরলেন। আর ঘুমে তলিয়ে গেলেন পরক্ষণেই।
একটা খুবই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে তাঁর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তিনি নিজেই স্বপ্নের কথা মনে করে বলে উঠলেন, “জানতাম না আমি, এটা ঈশ্বরের জায়গা!” তিনি জায়গাটার নাম দিলেন ‘বেথেল’। ‘বেথ’ মানে হিব্রুতে ঘর, আর ‘এল‘ হলো ঈশ্বর/আল্লাহ। তাই বেথেল মানে ‘ঈশ্বরের ঘর’। আর মানুষটির নাম? হযরত ইয়াকুব (আ)।
ইহুদীদের তাওরাত ও তাফসিরে ইবনে কাসিরে এ ঘটনাটি বলা আছে। কিন্তু কী ছিল সে স্বপ্ন যা দেখে তাঁর এটা মনে হলো? আর কীভাবেই বা এরপর কাহিনী গড়িয়ে তাঁর ছেলে হযরত ইউসুফ (আ) মিসরের এক দাস থেকে মিসর শাসকের ডান হাত হয়ে গিয়েছিলেন? তার চেয়েও বড় কথা, পবিত্র কুরআনে যেখানে বনী ইসরাইলকে তৎকালীন ‘সেরা জাতি’ (বাকারা ২:৪৭ ও ২:১২২) বলা হয়েছিল, এত উচ্চ স্থান থেকে কীভাবে তাদের পতন শুরু হয়? ইসলাম ও ইহুদী ধর্ম উভয় অনুযায়ীই বা কী করেছিল তারা?
 এই সেই বীরশেবা; Source: BiblePlaces.com

এসব নিয়ে বিস্তারিত আসবে আমাদের এই সিরিজের পরের পর্বে।
দ্বিতীয় পর্বঃ মিশরে যাবার আগে কেমন ছিল বনী ইসরাঈল?
 এ সিরিজের পর্বগুলো হলো:

প্রথম পর্ব: ইহুদী জাতির ইতিহাস: সূচনা পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব: মিশরে যাবার আগে কেমন ছিল বনি ইসরাইল?
তৃতীয় পর্ব: হযরত ইউসুফ (আ): দাসবালক থেকে মিসরের উজির- ইহুদী জাতির ইতিহাস
চতুর্থ পর্ব: ইউসুফ-জুলেখার কাহিনীর জানা অজানা অধ্যায়
পঞ্চম পর্ব: মসজিদুল আকসা আর বাইতুল মুকাদ্দাসের ইতিবৃত্ত
ষষ্ঠ পর্ব: দাসবন্দী বনী ইসরাইল এবং হযরত মুসা (আ:) এর জন্ম
সপ্তম পর্ব: মিসরের রাজপ্রাসাদ থেকে সিনাই পর্বত
অষ্টম পর্ব: সিনাই পর্বত থেকে ফারাওয়ের রাজদরবার
নবম পর্ব: মিসরের অভিশাপ
দশম পর্ব: দ্বিখণ্ডিত লোহিত সাগর, এক্সোডাসের সূচনা
একাদশ পর্ব: মরিস বুকাইলি আর ফিরাউনের সেই মমি
দ্বাদশ পর্ব: তূর পর্বতে ঐশ্বরিক সঙ্গ এবং তাওরাত লাভ
ত্রয়োদশ পর্ব: ইসরাইলের বাছুর পূজা এবং একজন সামেরির ইতিবৃত্ত
চতুর্দশ পর্ব: জীবন সায়াহ্নে দুই নবী
পঞ্চদশ পর্ব: রাহাব ও দুই গুপ্তচরের কাহিনী
ষোড়শ পর্ব: জেরিকোর পতন এবং স্যামসনের অলৌকিকতা
সপ্তদশ পর্ব: এক নতুন যুগের সূচনা


 Post credit: Abdullah Ibn Mahmud
রবীন্দ্রের লেখায় দ্বীন ইসলাম সংশ্লিষ্ট কিছুই নেই, কারণ রবীন্দ্রদের পৃথিবীতে মুসলমানদের জন্য কোনো জায়গাও নেই
==





রবীন্দ্রের লেখায় দ্বীন ইসলাম সংশ্লিষ্ট কিছু নেই, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। আবুল মনসুর আহমদ রচিত ‘বাংলাদেশের কালচার’ বইয়ের একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে তুলে ধরা হয় যে, “রবীন্দ্রের বিশ্ব-ভারতীর আকাশে কতোবার শরতের চন্দ্রোদয় হয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে ঈদ-মোহররমের চাঁদ উঠেনি।”
রবীন্দ্রদের এই মানসিকতা বিশ্লেষণে বসনিয়ার মুসলিম গণহত্যার একটি ঘটনা তুলে ধরা যেতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত The Bridge Betrayed: Religion and Genocide in Bosnia বইতে উল্লেখ রয়েছে-
The northeast Bosnian town of Zvornik was known for its heritage of Bosnian Muslim poets, saints, rebels, and mystics. From April through July of 1992 the Serb military killed or expelled the entire Muslim population. After all the mosques in the primarily Muslim town were dynamited and ploughed over, the new Serb nationalist mayor declared: "There never were any mosques in Zvornik." History could now be rewritten according to the desires of those who wished to claim that this land was always and purely Christian Serb.
অর্থ: বসনিয়ার উত্তরপূর্ব সভোরনিক শহরটি মশহুর ছিল তার মুসলমান কবি, আউলিয়া এবং সূফী ঐতিহ্যের জন্য। ১৯৯২ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সার্ব সন্ত্রাসীরা শহরটিকে সম্পূর্ণ মুসলিম শূন্য করে। মুসলিম প্রধান শহরটির প্রতিটি মসজিদকে ডিনামাইট দিয়ে বিধ্বস্ত করা হয়, অতঃপর মসজিদের জায়গাগুলো সমান করে সম্পূর্ণ চিহ্ন বিলীন করা হয়। শহরটির নবনির্বাচিত খ্রিস্টান মেয়র অতঃপর ঘোষণা দেয়, “সভোরনিক শহরে কখনোই কোনো মসজিদ ছিল না!” ইতিহাসকে এবার তাদের ইচ্ছানুযায়ী নতুন করে রচনা করা সম্ভব হলো, যারা দাবি করতে চায় যে এই শহরে সর্বদা একমাত্র খ্রিস্টানরাই বসবাস করত।”
এখন পূর্ব ইউরোপের সার্ব খ্রিস্টান বা ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়, যারা যথাক্রমে তুর্কী উসমানীয় শাসক এবং মোগল শাসক তথা মুসলমানদের প্রজা ছিল, তারা বাহ্যিক আচার-আচরণে মুসলমানদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করলেও সর্বদাই শয়নে-স্বপনে মুসলিম শাসনের অবসান কামনা করেছে। মুসলমানদের তীব্র ঘৃণা করা সত্ত্বেও তাদের অধীনে থাকতে হয়েছে বিধায় তাদের মনে বংশ পরম্পরায় আফসোস জন্ম নিয়েছে এই মর্মে যে, তাদের দেশে একটি মুসলমানও যদি না থাকত! এই চেতনা থেকেই তারা বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির বানায়, তাজমহলকে মন্দির দাবি করে। মুসলিম নামাঙ্কিত শহর-স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে। কারণ একদা মুসলমানদের গোলামি করার ইতিহাস মুছে ফেলার তাগিদে তারা মুসলমানদের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না।
রবীন্দ্রের লেখায় দ্বীন ইসলাম সংশ্লিষ্ট কিছুই নেই। কারণ রবীন্দ্র ও তার সম্প্রদায় ভুক্তদের যে দেশ কাম্য, যে পৃথিবী কাম্য, তাতে মুসলমানদের জন্য কোনো জায়গাও নেই। এই চেতনা থেকেই বর্তমানে ভারত সরকার তাদের দেশ থেকে সমস্ত মুসলিম বের করে দিতে চায়।